ভারতবর্ষে বিদেশী আক্রমণের তথ্যাদি
ভারতবর্ষে বিদেশী আক্রমণের ইতিহাস
মুহাম্মদ বিন কাসিম থেকে শুরু করে ইংরেজ শাসন পর্যন্ত - একটি গভীর ও বিশদ কালানুক্রমিক বিশ্লেষণ
ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে
ভারতবর্ষে মুসলিম আক্রমণের ইতিহাস: ৭১১-১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ
৭ম শতাব্দীতে ভারতবর্ষে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ছোট ছোট রাজ্য গঠিত হয়। সিন্ধু অঞ্চলে রাজা দাহিরের শাসন চলছিল। আরব বিশ্বে ইসলামের দ্রুত প্রসার ঘটছিল উমাইয়া খিলাফতের অধীনে।
খ্রি.
মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়
সেনাপতি: মুহাম্মদ বিন কাসিম (সিরিয়ার গভর্নর আল-হাজ্জাজের ভ্রাতুষ্পুত্র)
আদেশদাতা: উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদ প্রথম (৭০৫-৭১৫ খ্রি.)
কারণ: লঙ্কা যাত্রী আরব নারীদের জাহাজ দেবাল বন্দরে লুণ্ঠন
সৈন্য সংখ্যা: ৬,০০০ সিরীয় অশ্বারোহী + ৬,০০০ উটের সেনা
যুদ্ধের ধারাবাহিকতা:
- ৭১০: প্রথম প্রচেষ্টা (জুনায়েদ ব্যর্থ)
- ৭১১: বিন কাসিমের সফল আক্রমণ
- দেবাল, নিরুন, সেবান, সিসাম বিজয়
- রাওয়ার যুদ্ধ: রাজা দাহির নিহত
ফলাফল: সিন্ধু ও মুলতান বিজয়, ভারতের প্রথম মুসলিম শাসন
প্রশাসন: স্থানীয় ব্রাহ্মণদের সহায়তায় প্রশাসন চালনা
খ্রি.
মাহমুদ গজনভির ১৭ বার ভারত আক্রমণ
পটভূমি: গজনভি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা (পূর্বে সামানীয়দের অধীন)
সামরিক কৌশল: হালকা অশ্বারোহী বাহিনী, দ্রুত আক্রমণ ও প্রত্যাবর্তন
প্রধান লুণ্ঠন:
- ১০০৮-১০০৯: নাগরকোট (৭০০,০০০ দিনার মূল্য)
- ১০১৮: মথুরা (২০ মিলিয়ন দিনার মূল্য)
- ১০১৯: কনৌজ (৩ মিলিয়ন দিনার)
- ১০২৫: সোমনাথ মন্দির (২০ মিলিয়ন দিনার)
সোমনাথ আক্রমণের বিশদ:
- ১০২৪: গজনি থেকে যাত্রা (২,৫০০ কিমি)
- মুলতানের মধ্য দিয়ে থর মরুভূমি অতিক্রম
- ১০২৫: সোমনাথ দখল, শিবলিঙ্গ ধ্বংস
- লুণ্ঠিত সম্পদ: ২০ মিলিয়ন দিনার + মূল্যবান রত্ন
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন: লুণ্ঠনের উদ্দেশ্য প্রাধান্য, ইসলাম প্রচার গৌণ
খ্রি.
মুহাম্মদ ঘোরী ও দিল্লি সুলতানাতের ভিত্তি
ঘোরী সাম্রাজ্য: আফগানিস্তানের ঘোর অঞ্চল
প্রথম পর্যায় (১১৭৫-১১৯১):
- ১১৭৫: মুলতান বিজয়
- ১১৭৮: গুজরাটে পরাজয় (রাজা ভীমদেব সোলাঙ্কি)
- ১১৮৬: লাহোর বিজয়, শেষ গজনভি শাসক বন্দী
দ্বিতীয় পর্যায় (তরাইনের যুদ্ধ):
- প্রথম তরাইনের যুদ্ধ (১১৯১):
- ঘোরী বাহিনী: ১২০,০০০ (১২,০০০ অশ্বারোহী)
- চৌহান বাহিনী: ২০০,০০০ (৩০০ হাতি)
- ফলাফল: ঘোরী আহত, পালিয়ে যান
- দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধ (১১৯২):
- ঘোরীর নতুন কৌশল: ধনুকধারী অশ্বারোহী
- পৃথ্বীরাজ চৌহান বন্দী ও নিহত
- ফলাফল: উত্তর ভারত মুসলিম নিয়ন্ত্রণে
পরবর্তী কার্যক্রম:
- ১১৯৩: কনৌজ বিজয়
- ১১৯৪: চন্দেল রাজ্য আক্রমণ
- ১২০৬: ধোখর উপজাতি দ্বারা নিহত
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: স্থায়ী মুসলিম শাসনের সূচনা
খ্রি.
বাবর ও পানিপথের প্রথম যুদ্ধ
পটভূমি: তৈমুর বংশোদ্ভূত, ফারগানা ভ্যালির শাসক
ভারত আক্রমণের কারণ:
- মধ্য এশিয়ায় শক্তিশালী উজবেকদের চাপ
- দৌলত খান লোদী ও আলম খানের আমন্ত্রণ
- ভারতের সম্পদের প্রতি আকর্ষণ
পানিপথের প্রথম যুদ্ধের বিশদ:
- তারিখ: ২১ এপ্রিল, ১৫২৬
- স্থান: পানিপথ (দিল্লি থেকে ৯০ কিমি উত্তর)
- বাবরের বাহিনী:
- সৈন্য: ১২,০০০-১৫,০০০
- টুলঘমা ও আরাবা কৌশল
- উসমানীয় তোপখানা (রুমি চাল)
- ইবরাহিম লোদীর বাহিনী:
- সৈন্য: ৩০,০০০-৪০,০০০
- হাতি: ১০০ (কিন্তু প্রশিক্ষণবিহীন)
- কৌশল: ঐতিহ্যগত যুদ্ধ পদ্ধতি
- ফলাফল: ইবরাহিম লোদী নিহত (১৫,০০০ সৈন্য হারায়)
পরবর্তী কার্যক্রম:
- ১৫২৬: দিল্লি ও আগ্রা দখল
- ১৫২৭: খানুয়ার যুদ্ধ (রানা সাঙ্গা পরাজিত)
- ১৫২৮: চান্দেরির যুদ্ধ
- ১৫৩০: বাবরের মৃত্যু
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ৩৩২ বছরব্যাপী মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা
ভারতবর্ষে পর্তুগিজ আক্রমণ ও উপনিবেশ: ১৪৯৮-১৯৬১
খ্রি.
ভাস্কো দা গামার ভারত আগমন
পটভূমি: অটোমান তুর্কিদের দ্বারা ভূমধ্যসাগরীয় পথ বন্ধ
প্রিন্স হেনরির পরিকল্পনা: আফ্রিকা ঘুরে ভারত পথ আবিষ্কার
যাত্রার বিবরণ:
- ৮ জুলাই ১৪৯৭: লিসবন থেকে যাত্রা
- ৪ জাহাজ: সাও গ্যাব্রিয়েল, সাও রাফায়েল, বেরিও, স্টোকেজ জাহাজ
- ১৭০ জন নাবিক
- আফ্রিকা ঘুরে: কেপ অফ গুড হোপ অতিক্রম
- ২০ মে ১৪৯৮: কালিকট (কোঝিকোড়) পৌঁছান
কালিকটে অভ্যর্থনা: জামোরিন (রাজা) কর্তৃক স্বাগত
বাণিজ্যিক ফলাফল:
- মশলা (দারুচিনি, গোলমরিচ, লবঙ্গ) কেনাবেচা
- ভারতীয় পণ্য ইউরোপে নিয়ে যাওয়া
- ইউরোপ-এশিয়া সরাসরি সমুদ্রপথ প্রতিষ্ঠা
ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ভারতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক যুগের সূচনা
খ্রি.
দিউ যুদ্ধ: ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ আধিপত্য
দিউ দ্বীপের গুরুত্ব: গুজরাট উপকূলে কৌশলগত অবস্থান
পর্তুগিজ লক্ষ্য: আরব সাগরে বাণিজ্য একচেটিয়া করণ
মিশ্র জোট গঠন:
- গুজরাট সুলতান মাহমুদ বেগড়া
- মামলুক সুলতান আল-আশরাফ কানসুহ আল-গাউরি
- কালিকটের জামোরিন
- ভেনিস প্রজাতন্ত্র (অর্থায়ন)
যুদ্ধের বিবরণ:
- ফেব্রুয়ারি ৩, ১৫০৯
- পর্তুগিজ নেতা: ফ্রান্সিসকো দে আলমেইডা
- পর্তুগিজ জাহাজ: ১৮টি (উন্নত কামান)
- জোট জাহাজ: ১০০+ (প্রথাগত যুদ্ধপোত)
ফলাফল:
- পর্তুগিজদের বিশাল বিজয়
- মামলুক নেতা আমির হোসেন নিহত
- অটোমান-মামলুক জাহাজ ধ্বংস
- ভারত মহাসাগরে পর্তুগিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব: আরব ও ভারতীয় বণিকদের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ
খ্রি.
গোয়া বিজয়: পর্তুগিজ ভারতে রাজধানী
গোয়ার গুরুত্ব: প্রাকৃতিক বন্দর, কৃষিজমি, কৌশলগত অবস্থান
প্রথম প্রচেষ্টা (মার্চ ১৫১০):
- আদিল শাহী সালতানাতের বিরুদ্ধে
- আফনসো দে আলবুকের্কের নেতৃত্ব
- ফলাফল: পর্তুগিজরা পিছু হটে
দ্বিতীয় প্রচেষ্টা (২৫ নভেম্বর ১৫১০):
- বর্ষাকালের পর পুনরায় আক্রমণ
- ২৩টি জাহাজ, ১,৫০০ পর্তুগিজ সৈন্য
- স্থানীয় হিন্দু সমর্থন লাভ
- ফলাফল: গোয়া দখল, আদিল শাহী সৈন্য বিতাড়িত
গোয়া রাজধানী করা:
- কোচিন থেকে রাজধানী স্থানান্তর
- দুর্গ নির্মাণ: রেয়িস মাগোস, আগুয়াদা, চাপোরা
- নাগরিক পরিকল্পনা: শহর গোয়া (ওল্ড গোয়া)
প্রশাসনিক ব্যবস্থা:
- ভাইসরয় পদ সৃষ্টি
- ক্রিস্টান মিশনারি কার্যক্রম
- জেসুইট মিশন (সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার)
অর্থনৈতিক কার্যক্রম: মসলা বাণিজ্য, জাহাজ নির্মাণ, কৃষি
খ্রি.
গোয়া মুক্তিযুদ্ধ: ৪৫১ বছর পর্তুগিজ শাসনের সমাপ্তি
পটভূমি:
- ১৯৪৭: ভারত স্বাধীনতা লাভ
- পর্তুগাল স্বৈরশাসক আন্তোনিও সালাজার
- পর্তুগিজদের "অভ্যন্তরীণ প্রদেশ" দাবি
- কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ (১৯৫৫ সাল পর্যন্ত)
অপারেশন বিজয়:
- তারিখ: ১৮-১৯ ডিসেম্বর ১৯৬১
- ভারতীয় নেতা: জেনারেল জয়ন্ত নাথ চৌধুরী
- সৈন্য: ৩০,০০০ ভারতীয় vs ৩,০০০ পর্তুগিজ
- বাহিনী: স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনী সমন্বিত
যুদ্ধের বিবরণ:
- ১৮ ডিসেম্বর: বোমা হামলা শুরু
- ভারতীয় জাহাজ গোয়া বন্দর অবরোধ
- পর্তুগিজ জাহাজ এমএস সেগুরা আত্মসমর্পণ
- ১৯ ডিসেম্বর: পর্তুগিজ গভর্নর আত্মসমর্পণ
ক্ষয়ক্ষতি:
- ভারতীয়: ২২ জন নিহত, ৫৪ জন আহত
- পর্তুগিজ: ৩০ জন নিহত
- বেসামরিক: নগন্য
ফলাফল:
- গোয়া, দমন ও দিউ ভারতের সাথে যুক্ত
- পর্তুগালে সরকারের পতন (১৯৭৪ পর্যন্ত স্বীকৃতি না দেওয়া)
- ভারতে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার সমাপ্তি
ভারতবর্ষে ইংরেজ আক্রমণ ও শাসন: ১৬০০-১৯৪৭
খ্রি.
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রতিষ্ঠা
রাজকীয় সনদ: রানি এলিজাবেথ প্রথম কর্তৃক ৩১ ডিসেম্বর ১৬০০
উদ্দেশ্য: পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাথে বাণিজ্য
একচেটিয়া অধিকার: ১৫ বছরের জন্য ভারতের সাথে বাণিজ্য
প্রথম অভিযান:
- ১৬০৮: ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হকিন্স মুঘল দরবারে
- জাহাজ: হেক্টর, বিক্ষিপ্ত মেঘ
- লক্ষ্য: সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন
- ফলাফল: জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে সীমিত অনুমতি
প্রথম কারখানা স্থাপন:
- ১৬১২: সুরাটে প্রথম কারখানা
- ১৬১৫: স্যার টমাস রো জাহাঙ্গীরের দরবারে
- অনুমতি: বাণিজ্য করার ও দুর্গ নির্মাণের অধিকার
প্রধান শহর প্রতিষ্ঠা:
- ১৬৩৯: মাদ্রাজ (ফর্ট সেন্ট জর্জ)
- ১৬৬৮: বোম্বে (পর্তুগাল থেকে প্রাপ্ত)
- ১৬৯০: কলকাতা (জব চার্নক)
প্রাথমিক বাণিজ্য: তুলা, রেশম, নীল, মসলা
খ্রি.
পলাশীর যুদ্ধ: ভারতীয় ইতিহাসের জলবিভাজিকা
পটভূমি:
- বাংলার নবাব আলীবর্দী খান (মৃত্যু ১৭৫৬)
- সিরাজউদ্দৌলা (২৩ বছর বয়সে সিংহাসন)
- ইংরেজদের অবৈধ দুর্গ নির্মাণ
- কালা পাহাড়ে ইংরেজদের বন্দী করা (১৭৫৬)
যুদ্ধের প্রস্তুতি:
- সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী:
- সৈন্য: ৫০,০০০ (৩৫,০০০ পদাতিক, ১৫,০০০ অশ্বারোহী)
- হাতি: ৫৩টি যুদ্ধহাতি
- কামান: ৫৩টি ফরাসি কামান
- সেনাপতি: মীর মদন, মোহন লাল
- ইংরেজ বাহিনী:
- সৈন্য: ৩,০০০ (১,০০০ ইউরোপীয়, ২,০০০ সিপাহী)
- কমান্ডার: রবার্ট ক্লাইভ
- কামান: ৮টি আর্টিলারি
বিশ্বাসঘাতকতা:
- মীর জাফর: প্রধান সেনাপতি (ইংরেজদের সাথে চুক্তি)
- রায় দুর্লভ: অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান
- জগৎ শেঠ: অর্থনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার
- ওমিচাঁদ: দ্বৈত ভূমিকা
যুদ্ধের দিন (২৩ জুন ১৭৫৭):
- বেলা ৮টা: যুদ্ধ শুরু
- বৃষ্টি: বাংলার কামান অকার্যকর
- বিকাল ৩টা: মীর জাফরের বাহিনী নিষ্ক্রিয়
- বিকাল ৫টা: সিরাজউদ্দৌলা পলায়ন
ফলাফল:
- সিরাজউদ্দৌলা বন্দী ও নিহত (২ জুলাই)
- মীর জাফর বাংলার নবাব
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার প্রকৃত শাসক
- ২৪ পরগনা জেলা লাভ, সৈন্য রাখার অধিকার
খ্রি.
সিপাহী বিদ্রোহ: প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম
পটভূমি:
- ডকট্রিন অফ ল্যাপস (১৮৪৮-১৮৫৬)
- ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী নীতির সম্প্রসারণ
- ভারতীয় ঐতিহ্য ও ধর্মে হস্তক্ষেপ
- অর্থনৈতিক শোষণ বৃদ্ধি
তাত্ক্ষণিক কারণ:
- এনফিল্ড রাইফেল:
- কার্তুজ মাড়াতে হতো দাঁত দিয়ে
- চর্বি: গরু (হিন্দুদের জন্য নিষিদ্ধ) ও শূকর (মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ)
- ৮৫ তম রেজিমেন্ট প্রত্যাখ্যান (২৯ মার্চ ১৮৫৭)
- ধর্মীয় সংবেদনশীলতা:
- ধর্মান্তরকরণের প্রচেষ্টা
- খ্রিস্টান মিশনারিদের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা
বিদ্রোহের সূচনা:
- ১০ মে ১৮৫৭: মিরাটে বিদ্রোহ
- ১১ মে: দিল্লি দখল, বাহাদুর শাহ জাফরকে সম্রাট ঘোষণা
- জুন-জুলাই: কানপুর, লক্ষ্ণৌ, ঝাঁসি, বিহারে বিদ্রোহ ছড়ায়
প্রধান নেতৃবৃন্দ:
- মঙ্গল পাণ্ডে (২৯ মার্চ ১৮৫৭)
- রানি লক্ষ্মীবাঈ (ঝাঁসি)
- তাতিয়া টোপে
- নানাসাহেব (কানপুর)
- বেগম হজরত মহল (লক্ষ্ণৌ)
দমন ও ফলাফল:
- সেপ্টেম্বর ১৮৫৭: দিল্লি পুনরুদ্ধার
- জুন ১৮৫৮: রানি লক্ষ্মীবাঈ শহীদ
- ১৮৫৮: ভারত শাসন আইন
- ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলুপ্ত
- সরাসরি ব্রিটিশ রাজের শাসন শুরু
- ১ নভেম্বর ১৮৫৮: রানি ভিক্টোরিয়া ভারতের সম্রাজ্ঞী ঘোষণা
খ্রি.
ভারতের স্বাধীনতা: ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি
পটভূমি:
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেন দুর্বল
- ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আন্দোলন
- মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবি
- সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বৃদ্ধি
মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা:
- ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭: লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতের ভাইসরয় নিযুক্ত
- ৩ জুন ১৯৪৭: বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণা
- ব্রিটিশ ভারত বিভক্ত: ভারত ও পাকিস্তান
- স্বাধীনতা তারিখ: ১৫ আগস্ট ১৯৪৭
ভারত স্বাধীনতা আইন ১৯৪৭:
- ব্রিটিশ সংসদে পাস: ১৮ জুলাই ১৯৪৭
- সম্পূর্ণ আইনী সার্বভৌমত্ব হস্তান্তর
- ব্রিটিশ রাজার সমস্ত ক্ষমতা শেষ
স্বাধীনতা দিবস:
- ১৪ আগস্ট ১৯৪৭: পাকিস্তান স্বাধীনতা
- ১৫ আগস্ট ১৯৪৭: ভারত স্বাধীনতা
- দিল্লির লাল কিলায় ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা উত্তোলন
- জওহরলাল নেহরু: "Tryst with Destiny" ভাষণ
দেশ বিভাগের প্রভাব:
- জনসংখ্যা বিনিময়: ১.৪-২ কোটি মানুষ স্থানান্তর
- সাম্প্রদায়িক হিংসা: ২-৫ লাখ মানুষ নিহত
- অর্থনৈতিক বিভাজন: সম্পদ ও অবকাঠামো বিভক্ত
- ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন: নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি
ব্রিটিশ শাসনের সারসংক্ষেপ:
- শাসনকাল: ১৯০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭)
- সাক্ষরতা বৃদ্ধি: ৩% থেকে ১২%
- রেলপথ: ৪০,০০০ মাইল
- সেচ প্রকল্প বৃদ্ধি
- অর্থনৈতিক শোষণ: ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে স্থানান্তর
তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| আক্রমণকারী | সময়কাল | প্রধান লক্ষ্য | স্থায়িত্ব | সামরিক কৌশল | সাংস্কৃতিক প্রভাব |
|---|---|---|---|---|---|
| মুহাম্মদ বিন কাসিম | ৭১১ খ্রিস্টাব্দ | সিন্ধু বিজয়, প্রতিশোধ, ইসলামের প্রসার | অস্থায়ী (৩ বছরের শাসন) | প্রথাগত আরব যুদ্ধ কৌশল, নৌবাহিনী | ভারতে প্রথম ইসলামী প্রভাব, আরবি ভাষা ও সংস্কৃতি |
| মাহমুদ গজনভি | ৯৯৭-১০৩০ | লুণ্ঠন, ধনসম্পদ সংগ্রহ, সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ | অস্থায়ী (লুণ্ঠন ও প্রত্যাবর্তন) | হালকা অশ্বারোহী, দ্রুত আক্রমণ, পুনরায় দ্রুত ফিরে আসা | মন্দির ধ্বংস, উত্তর ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত |
| মুহাম্মদ ঘোরী | ১১৭৫-১২০৬ | স্থায়ী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ | স্থায়ী (দিল্লি সুলতানাতের ভিত্তি) | ধনুকধারী অশ্বারোহী, স্থায়ী দুর্গ নির্মাণ | ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা, ফার্সি ভাষার প্রবর্তন, স্থাপত্য শৈলীতে পরিবর্তন |
| বাবর (মুঘল) | ১৫২৬-১৫৩০ | সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ | স্থায়ী (৩৩২ বছর মুঘল শাসন) | তোপখানা (রুমি চাল), টুলঘমা ও আরাবা কৌশল | তুর্কি-মঙ্গোল-ফার্সি-ভারতীয় সংস্কৃতির সমন্বয়, মুঘল স্থাপত্যের সূচনা |
| পর্তুগিজরা | ১৪৯৮-১৯৬১ | বাণিজ্য একচেটিয়া করণ, মশলা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ | ৪৬৩ বছর (গোয়া, দমন, দিউ) | নৌবাহিনী, সমুদ্র দুর্গ, কামানযুক্ত জাহাজ | খ্রিস্টান ধর্ম প্রচার, লাতিন বর্ণমালার প্রবর্তন, গোয়ান সংস্কৃতি গঠন |
| ইংরেজরা | ১৬০০-১৯৪৭ | রাজনৈতিক শাসন, অর্থনৈতিক শোষণ, সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ | ১৯০ বছর (সক্রিয় শাসন, ১৭৫৭-১৯৪৭) | অনুশাসিত সেনাবাহিনী, নৌশক্তি, কূটনৈতিক কৌশল | ইংরেজি ভাষা, পশ্চিমা শিক্ষা, আধুনিক প্রশাসন, রেলপথ, আইন ব্যবস্থা, ক্রিকেট |
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও সারসংক্ষেপ
মুসলিম আক্রমণের বৈশিষ্ট্য: ৭১১ থেকে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ৮১৫ বছরের সময়কালে ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে লুণ্ঠন ও অস্থায়ী বিজয় (মাহমুদ গজনভি) থেকে ধীরে ধীরে স্থায়ী সাম্রাজ্যে (ঘোরী, মুঘল) রূপান্তর ঘটে। মুঘলরা সর্বাপেক্ষা সফল স্থায়ী শাসন প্রতিষ্ঠা করে যারা ভারতীয় ও ইসলামী সংস্কৃতির এক অসাধারণ সমন্বয় ঘটায়।
পর্তুগিজদের ভূমিকা: পর্তুগিজরা ছিল ভারতে প্রথম ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারী, যারা ৪৬৩ বছর ধরে গোয়া, দমন ও দিউ শাসন করেছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বাণিজ্যিক একচেটিয়াকরণ, বিশেষত মশলা বাণিজ্য। ধর্মীয় রূপান্তর তাদের দ্বিতীয় লক্ষ্য ছিল। তারা ভারত মহাসাগরে নৌ-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে কিন্তু স্থলভাগে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যর্থ হয়।
ইংরেজ শাসনের প্রভাব: ইংরেজরা ১৯০ বছর ধরে সমগ্র ভারত শাসন করে সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। তারা আধুনিক শিক্ষা, রেলপথ, ডাকবিভাগ, আইন ব্যবস্থা, গণতন্ত্রের ধারণা প্রবর্তন করে। কিন্তু একই সাথে তারা ভারতের সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করে, ঐতিহ্যগত শিল্প ধ্বংস করে এবং অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে ভারতকে দরিদ্র করে তোলে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন: প্রতিটি আক্রমণকারীরই আলাদা উদ্দেশ্য, কৌশল ও সাফল্য ছিল। মুসলিম আক্রমণকারীরা মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা ও ধর্মীয় প্রসারের লক্ষ্যে এগিয়েছে। পর্তুগিজরা বাণিজ্যিক একচেটিয়াকরণে মনোনিবেশ করেছে। ইংরেজরা সম্পূর্ণ শাসন ও অর্থনৈতিক শোষণের মাধ্যমে তাদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য হাসিল করেছে। সামগ্রিকভাবে এই সকল আক্রমণ ও শাসন ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে চিরতরে রূপান্তরিত করেছে।